সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে জিডিপি বেড়েছে ১ দশমিক ৪ শতাংশ, যা তৃতীয় প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ৪ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। সামগ্রিকভাবে ২০২৫ সালে মার্কিন অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২ দশমিক ২ শতাংশ, যা এর আগের বছরের ২ দশমিক ৩ শতাংশের তুলনায় কম। খবর এফটি।
বিশ্লেষকদের মতে, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও গ্রাহক চাহিদার সংকোচন বিশ্বের বৃহত্তম এ অর্থনীতির গতি কমিয়ে দিয়েছে।
টানা ছয় সপ্তাহের সরকারি অচলাবস্থায় বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে মার্কিন অর্থনীতি। অর্থনীতিবিদদের মতে, এ শাটডাউনের কারণেই বছরের শেষ প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশ কমে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাধারণ মানুষের কেনাকাটা কমিয়ে দেয়ার প্রবণতা। তবে শাটডাউন শেষে সরকারি কর্মীরা বকেয়া বেতন পাওয়ায় ও সরকারি খরচ ফের শুরু হওয়ায় এ মন্দাভাব দ্রুতই কেটে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যবসায়িক খাতের জন্য এটি ছিল একটি অস্থির বছর। বিশেষ করে শুল্ক আরোপ ও প্রত্যাহারের অনিয়মিত সিদ্ধান্তের কারণে সাপ্লাই চেইন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
ব্যাংকরেটের সিনিয়র অর্থনৈতিক বিশ্লেষক মার্ক হ্যামরিক বলেন, ‘প্রকৃত চিত্রটি হলো একটি রশি টানাটানি লড়াইয়ের মতো। এখানে ভোক্তাদের সহনশীলতা ও এআই অবকাঠামোর বিশাল জোয়ার একদিকে কাজ করছে, আর সরকারি নীতি ও বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা অন্যদিকে বাধা সৃষ্টি করছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির মূল শক্তি হলো দেশের মানুষের খরচ করার প্রবণতা। দেশটির জিডিপি দুই-তৃতীয়াংশই আসে সাধারণ মানুষের এ কেনাকাটা থেকে। গত বছরের শেষ তিন মাসে এ ব্যয় ২ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আর অর্থনীতি নিয়ে দুশ্চিন্তার মধ্যেও মার্কিন নাগরিকরা কেনাকাটা অব্যাহত রেখেছেন। আর এ খরচের ওপর ভর করেই মার্কিন অর্থনীতি সঠিক পথে রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বেকারত্বের নিম্ন হার ও নিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের সামষ্টিক অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা। অর্থনীতিবিদ গ্রেগরি ডাকোর মতে, বর্তমান প্রবৃদ্ধি কেবল ধনী শ্রেণীর খরচ, এআই খাতে বিনিয়োগ আর শেয়ার ও সম্পদের দাম বাড়ার ওপর টিকে আছে। ফলে প্রযুক্তির সুফল ও সম্পদ বৃদ্ধির এ ধারা থেকে পিছিয়ে থাকা সাধারণ ভোক্তা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপে রয়েছে।
মার্কিন অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির একটি বড় অংশ এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল। গত বছরের শেষ প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রায় অর্ধেকই এসেছে এআই প্রযুক্তি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রক্রিয়াকরণ যন্ত্রপাতির বিক্রি থেকে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এ এআই-নির্ভরতা ভবিষ্যতের জন্য একটি ঝুঁকিও হতে পারে। যদি কোনো কারণে বিনিয়োগকারীরা এ খাতের ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলেন, তবে পুরো অর্থনীতি বড় ধাক্কা খেতে পারে।
অন্যদিকে এপ্রিলে ট্রাম্পের ঘোষিত ‘লিবারেশন ডে’-তে শুল্ক নিয়ে যে পরিস্থিতির আশঙ্কা করা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তা ততটা ভয়াবহ হয়নি। কারণ অনেক ক্ষেত্রে শুল্কের হার কমানো হয়েছিল কিংবা বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে তা প্রত্যাহার করা হয়েছিল। তবে সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায়ের পর ব্যবসায়িক মহলে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আদালত জানিয়েছেন, বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশের ওপর নির্বিচারে শুল্ক চাপিয়ে ট্রাম্প তার ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। সর্বজনীন শুল্ক বা গ্লোবাল ট্যারিফ নীতিকে অবৈধ ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট। এরপর মঙ্গলবার থেকে ১৫০ দিনের জন্য সাময়িকভাবে ১০ শতাংশ বৈশ্বিক আমদানি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প।